জীবনের উৎপত্তি এবং কৃত্রিম প্রাণ নিয়ে গবেষণা আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম আকর্ষণীয় ও জটিল ক্ষেত্র। ১৮০৯ সালে বারজেলিয়াস এর দেওয়া ভাইটাল ফোর্স তত্ত্ব মাত্র ১৯ বছরের ব্যাবধানে ফ্রেডরিখ ভোলার (Friedrich Wöhler, ১৮০০–১৮৮২) -এর ইউরিয়া তৈরির মাধ্যমে ভেঙ্গে পড়লো। ভাইটাল ফোরস তত্ত্ব বলেছিল অজৈব পদার্থ থেকে জৈব পদার্থ তৈরি করা প্রান শক্তি ছাড়া সম্ভব নয়। ফ্রেডরিখ ভোলার আমোনিয়াম স্যায়ানেট এবং পটাসিয়াম স্যায়ানেট এর মিশ্রণ থেকে ইউরিয়া উৎপাদন করে দেখালেন ভাইটাল ফোর্স তত্ত্ব ভুল।
সময়ের পরিক্রমায় বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে কুসংস্কার দূরীভূত হওয়ার সাথে সাথে মানুষেরও উপকার হলো। এর পরে আর জৈব রসায়ন-এর অগ্রগতিকে আর থামিয়ে রাখা গেলনা। ১৯৫৩ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে কালজয়ী একটা গবেষণা করলেন মুলার ( Miller-Urey Experiment) নামের এক বৈজ্ঞানিক। তিনি অজৈব পদার্থ থেকে প্রোটিন তৈরির মুল উপাদান এ্যামাইনো এসিড তৈরি করে ফেললেন।
২০০৭ সালে এই পরীক্ষা পুনরায় করা হয় এবং দেখা যায় প্রানীর শরীরে অবস্থিত ২০ টা এমাইনো এসিডই এর ভিতর আছে। এই প্রক্রিয়ার সাথে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মত পরিবেশ যোগ করলে আরও বেশি এমাইনো এসিড পাওয়া যায়। সুদারলান্দ নামের আর এক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করে বসলেন কৃত্রিম আর এন এ (RNA), ২০০৯ সালে প্রকাশিত এই গবেষণা হই চই ফেলে দিল। কারন ধারনা করা হয় প্রান সৃষ্টির সময় প্রথমে আর এন এ তৈরি হয়েছে এবং সেখান থেকে ডি এন এ (DNA) তৈরি হয়ে তারপর এক কোষী প্রানের সৃষ্টি।
এই প্রানের অভ্যুদয় এর জন্য যে পরিবেশ অর্থাৎ তাপমাত্রা, আদ্রতা, চাপ, বজ্রশক্তি প্রয়োজন তা গবেশনাগারে কৃত্রিমভাবে তৈরি করেই আর এন এ উৎপাদিত হয়েছে। প্রান সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব এতে শক্ত ভিত্তি পেল। এরপর আর এন এ কে ছাঁচ (Template) হিশাবে কাজে লাগিয়ে ডি এন এ তৈরি করা সম্ভব হল, তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এল ডঃ জন ক্রেগ ভেন্টার এর আবিষ্কার থেকে।
২০১০ সালে প্রকাশিত এই গবেষণা বায়োলজীকে একবারে অনেক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল। তিনি অজৈব পদার্থ থেকে ডি এন এ তৈরি করে ফেললেন, এবার একটা কোষ থেকে তার ডি এন এ বের করে ফেলে ঐ কোষের মধ্যে কৃত্রিম ডি এন এ ঢুকিয়ে দিলেন। বিস্ময়কর ব্যাপার ঘটলো, কোষটা বিভাজিত হতে লাগলো। সমালোচনার শেষ থাকল না, তিনি একজন খেলোয়াড় ঈশ্বর (Playing god) হিসাবে নিজেকে দেখতে চাইছেন এমন অভিযোগ উঠলো। অনেকে এর উপকারী দিক নিয়ে কথা বললেন, আবার অনেকেই বিপক্ষে গেলেন।
প্রানের উৎস সম্পর্কে থিওরীসমুহঃ
এই আলোচনায় আমি থিওলজীক্যাল তথ্য নিয়ে কোন মতামত দিচ্ছি না, শুধু বিভিন্ন রেফারেন্স থেকৈ বৈজ্ঞানিক গবেষণার নির্যাস তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
১। বায়োজেনেসিস (Biogenesis)
Louis Pasteur, Rudolf Virchow, and Robert Remak এরা হলেন বায়োজেনেসিস (Biogenesis) তত্ত্বের মূল প্রবক্তা। এদের মতে জীবনের শুরু অন্য জীবন থেকে। এ সম্বন্ধে লুই পাস্তুরের গবষনা প্রনিধানযোগ্য। পচা দ্রব্য (Spontaneous generation) থেকে ম্যাগটের যে উৎপত্তি হয় না তা এই গবেষনায় প্রমানিত।
২। এবায়োজেনেসিস (Abiogenesis)
যদিও বায়োজেনেসিস এর স্বপক্ষের বিজ্ঞানীরা এবায়োজেনেসিস এর বিপক্ষে প্রমান দিয়েছেন, তবুও প্রানের উৎপত্তি সম্বন্ধে এবায়োজেনেসিস (প্রানের উৎপত্তি) এর ধারনাই নতুন করে বৈজ্ঞানিক মহলকে নাড়া দিয়েছে এবং কৃত্রিমভাবে প্রান সৃষ্টির মূলে এই ধারনাই আবার কাজ করছে।
এবায়োজেনেসিস হচ্ছে অজৈব পদার্থ থেকে জৈব পদার্থ, তারপর সরল জৈব পদার্থ থেকে ক্রমশ জটিল জৈব পদার্থের সৃষ্টি হয়ে কোষহীন, এককোষী এবং বহুকোষী জীবনের সৃষ্টি। এবায়োজেনেসিস হচ্ছে প্রানের উৎপত্তির মূল পর্যায় এবং বায়োজেনেসিস হচ্ছে এর বিকাশ বাঁ বিবর্তনের অপর পর্যায়।
এখানে দুইটি বিষয় কাজ করছে, একটা হলো পৃথিবীতে কীভাবে প্রানের উৎপত্তি হয়েছে, সে বিষয়, এবং আরেকটি হচ্ছে কৃত্রিম ভাবে গবেষণাগারে প্রান উৎপাদন করা যায় কিনা এ বিষয়ে। দুটো গবেষনাই চলমান, কিন্তু এখন পর্যন্ত অগ্রগতি হলেও এখনও শেষ কথা বলার মতো সময় এখনও আসেনি।
এখনকার বৈজ্ঞানিকদের ধারণা রসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে সমুদ্রে কোন উষ্ণ প্রস্রবনের তলায় প্রথমে সরল মলিকিউল থেকে ম্যাক্রোমলিকিউল, তারথেকে RNA, তারথেকে DNA, তারপর প্রোটিন, এগুলো থেকে Microsphere , Cocervate, Protocell এইভাবে ক্রমশঃ জটিল এবং উন্নত কোষ এবং প্রান তৈরী হয়েছে (Haldane-Oparin Theory)।
সোভিয়েত বিজ্ঞানী Alexander Oparin আবিষ্কার করেন Cocervates বা একপর্দার লিপিড মেম্ব্রেন, এবং Sydney Fox আবিষ্কার করেন Microsphere দুই পর্দার প্রোটিন এবং লিপিডের মেম্ব্রেন, এগুলো ল্যাবরেটরীতে তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
বৈজ্ঞানিকেরা নিম্নলিখিত পর্যায়ে প্রানের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করেন।
Oparin-Haldane Hypothesis (1920s)
- Early Earth had a reducing atmosphere (methane, ammonia, hydrogen, water vapor).
- Energy sources (UV radiation, lightning, volcanic activity) drove chemical reactions.
- Simple organic molecules (amino acids, sugars, nucleotides) formed in the “primordial soup.”
- These molecules combined into polymers (proteins, nucleic acids).
- Eventually, coacervates/protocells formed, leading to primitive metabolism and replication.
Simple Chemical—Polymer—Replicating polymer—Hypercycle- Protobiont—Protocell—Prokaryotes—Eukaryotescal→Polymer→Replicating
৩। বহির্জাগতিক প্রাণ (Extraterrestial source)
পৃথিবীর বাইরে থেকে প্রানের অভ্যুদয়, উল্কাপিন্ড, মিটিয়োরাইট ইত্যাদি থেকে ম্যাক্রোমলিকিউল গুলো আসতে পারে যার থেকে পরবর্তীতে প্রানের উদ্ভব হয়েছে। এটা নিয়ে তেমন কোন গবেষণা আর চলছে না। এগুলোর ভিতর প্রোটিন ঢুকে পুঞ্জীভুত হয়ে অনেকটা Organnel এর মতো কাজ করে।
Modern Theories of Origin of Life
1. Oparin–Haldane Hypothesis (Chemical Evolution Theory)
- Life arose gradually from simple molecules in a reducing atmosphere.
- Supported by Miller–Urey experiment (1953).
2. RNA World Hypothesis
- RNA was the first self-replicating molecule, acting as both genetic material and catalyst.
- Explains transition to DNA–protein world. 3. Protein World Hypothesis
- Proteins (enzymes) formed first and drove early metabolism before genetic systems evolved.
4. DNA World Hypothesis
- DNA, being more stable, may have emerged early as the primary genetic material.
5. Coacervate/Protocell Theory
- Droplets of organic molecules (coacervates) formed primitive cell-like structures, leading to protocells.
6. Iron–Sulfur World Hypothesis (Wächtershäuser)
- Life began at hydrothermal vents, with iron–sulfur surfaces catalyzing organic reactions.
7. Deep-Sea Vent Hypothesis
- Hydrothermal vents provided energy and mineral-rich environments for life’s origin.
8. Clay Hypothesis (Cairns-Smith)
- Clay minerals acted as templates for the assembly of organic molecules.
9. Panspermia Hypothesis
- Life (or its precursors) came from outer space, delivered via comets or meteorites.
10. Autocatalytic Sets Theory
- Life began as networks of molecules that catalyzed each other’s formation, leading to self-sustaining systems.
In summary:
Modern science doesn’t rely on a single theory but explores multiple pathways—chemical evolution, RNA world, hydrothermal vents, clay surfaces, and even panspermia—as possible explanations for how life began.
প্রানের সংজ্ঞা:
প্রানের সংজ্ঞা দেওয়া বেশ কঠিন। নাসার (NASA) সংজ্ঞা অনুযায়ী্’ জীবন হচ্ছে স্বনির্ভরশীল একটা রাসায়নিক পদ্ধতি, যা বিবর্তিত হতে সক্ষম (A self-sustainig chemical system capable of Darwinian evolution)।
প্রান থাকলে তার জন্ম মৃত্যু, বিপাক এবং বিকাশ থাকবে। পৃথিবীতে প্রানের উৎপত্তি প্রায় ৩-৮ থেকে ৪-৮ বিলিয়ন বছর আগে। আর প্রানের রহস্য ভেদ করার চেষ্টা চলছে ১০০ বছর আগে থেকে, এখনও অনেক পথ চলা বাকী, তবে বিজ্ঞান থেমে নেই। একটা থিওরী বা হাইপোথিসিস এর উপর নির্ভর না করে তারা বিভিন্ন থিওরীর উপর কাজ করছেন, যাতে সত্যিকারের ফল পাওয়া যায়।
বর্তমানের কৃত্রিম প্রাণ নিয়ে গবেষণা:
এখনকার গবেষণা মূলত নিয়োযিত আছে , প্রান সৃষ্টির প্রাথমিক অবস্থার পুনর্নির্মানে, যেমন-আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মত অবস্থা তৈরি করতে, বিভিন্ন রকমের রাসায়নিক বিকৃয়ার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ বিনির্মানে, পলিমার সশ্লেষনে, প্রোটোসেল তৈরিতে, কৃত্রিম RNA, DNA, Protein=Lipid পলিমার ইত্যাদি তৈরিতে।
প্রোটোসেল লাবরেটরীতে তৈরি করে তা দিয়ে বিপাক, বৃদ্ধি, কোষ বিভাজন ইত্যাদি করানো সম্ভব হয়েছে ‘কিন্তু এখনও পুর্নাংজ্ঞ কোষ তৈরি করা সম্ভব হয়নি, তবে অদুর ভবিষ্যতে যে হবে তা প্রায় নিশ্চিত। গবেষণার অগ্রভাগে যেসব বৈজ্ঞানিক কাজ করছেন তাদের কয়েকজনের নাম এখানে দেওয়া হলো, তাদের কাজের সাথে পরিচিত হবার জন্য।
কৃত্রিম জীবন বিনির্মানে কাজ করছেন Alan Turing, Christopher Langton, John von Neumann, Craig Venter, Margaret Boden, Tom Froese & Carlos Gershenson এর মত দিকপালরা। এরা বিভিন্ন আংগিকে কাজ করছেন, কেউ synthetic Biology, কেউ Mathematical designing, কেউ Computer algorithom, কেউ Non-biological life ইত্যাদি নিয়ে রিসার্চ করছেন। এদের নাম দিয়ে Google search দিয়ে আগ্রহী পাঠকগন তাদের কাজ সম্বন্ধে জানতে পারবেন।
মুক্ত প্রানে ইতিপুর্বে আমার একটা লেখা আছে এ বিষয়ে, আগ্রহী পাঠকেরা পড়ে দেখতে পারেন। লেখা: প্রাণের উৎস সন্ধানে বিজ্ঞানের যত গবেষণা!
উপসংহার
কৃত্রিম প্রাণ এবং জীবনের উৎপত্তি নিয়ে গবেষণা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি, তবে অগ্রগতি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। Miller–Urey Experiment থেকে শুরু করে Craig Venter-এর কৃত্রিম কোষ তৈরি—সবই প্রমাণ করে যে জীবনকে বুঝতে এবং তৈরি করতে বিজ্ঞান ধীরে ধীরে সক্ষম হয়ে উঠছে।
তবে এখনও সম্পূর্ণ জীবন্ত কোষ ল্যাবে তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতে এই লক্ষ্য অর্জিত হলে তা চিকিৎসা, পরিবেশ রক্ষা, জ্বালানি উৎপাদন এবং এমনকি মহাকাশে জীবনের সন্ধানে বিপ্লব ঘটাতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, জীবন সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা শুধু একটি বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান নয়—এটি মানব সভ্যতার সবচেয়ে গভীর প্রশ্নের উত্তর খোঁজার এক অবিরাম যাত্রা। বিজ্ঞান থেমে নেই, আর সেই পথচলায় কৃত্রিম প্রাণ গবেষণা এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।













